ক. জৈব বিবর্তন কী?
উত্তর: যে ধারাবাহিক ও ধীর গতিসম্পন্ন গতিশীল প্রক্রিয়ায় কালের পরিক্রমায় সরলতম আদি জীব থেকে পরিবর্তিত হয়ে জটিল ও উন্নততর নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়, তাকে জৈব বিবর্তন (Organic Evolution) বলে।
খ. প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদ বলতে কী বুঝ?
উত্তর: ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন (Charles Darwin) কর্তৃক প্রবর্তিত বিবর্তন সম্পর্কিত একটি সুপরিচিত তত্ত্ব হলো প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদ (Theory of Natural Selection)।
ব্যাখ্যা: প্রাকৃতিক নির্বাচন মতবাদ অনুযায়ী, প্রতিটি জীব জ্যামিতিক ও গাণিতিক হারে বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু খাদ্য ও বাসস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে জীবের মধ্যে প্রবল 'জীবন সংগ্রাম' শুরু হয়। এই সংগ্রামে যেসব জীব প্রকৃতির পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলার উপযোগী অনুকূল পরিব্যক্তি বা বৈশিষ্ট্য লাভ করে, প্রকৃতি কেবল তাদেরকেই বেঁচে থাকার জন্য নির্বাচিত করে (উদ্বর্তন বা 'Survival of the Fittest')। অন্যদিকে অনোপযোগী জীবগুলো ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। বেঁচে থাকা নির্বাচিত জীবগুলো বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের অনুকূল বৈশিষ্ট্যসমূহ পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত করে এবং বহু যুগ ধরে এ প্রক্রিয়া চলার মাধ্যমে নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়।
গ. ফারহানের গবেষণার ফলাফল চেকার বোর্ডের সাহায্যে দেখাও
উত্তর: উদ্দীপকে ফারহান লাল ও সাদা ফুলের মধ্যে ক্রস ঘটিয়ে গোলাপি রঙের ফুল পেয়েছেন। এটি বংশগতির অসম্পূর্ণ প্রকটতা (Incomplete Dominance) নির্দেশ করে।
অসম্পূর্ণ প্রকটতার সংজ্ঞায়ন: যখন একজোড়া বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন দুটি বিশুদ্ধ জীবের মধ্যে সংকরায়ন ঘটানো হয়, কিন্তু F₁ জনুতে প্রকট অ্যালিলটি প্রচ্ছন্ন অ্যালিলের ওপর পূর্ণরূপে প্রকট হতে পারে না, ফলে উভয় বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণে একটি মধ্যবর্তী বৈশিষ্ট্য (গোলাপি) প্রকাশিত হয়, তখন তাকে অসম্পূর্ণ প্রকটতা বলে।
জিনতাত্ত্বিক প্রতীকায়িত রূপ: ধরি,
• লাল ফুলের জন্য দায়ী প্রকট জিন = R
• সাদা ফুলের জন্য দায়ী প্রচ্ছন্ন জিন = r
• বিশুদ্ধ লাল ফুলের জিনোটাইপ = RR
• বিশুদ্ধ সাদা ফুলের জিনোটাইপ = rr
F₁ জনু: পিতামাতা (P₁): বিশুদ্ধ লাল (RR) × বিশুদ্ধ সাদা (rr)
গ্যামেট: R এবং r
F₁ অপত্য: Rr (সকল ফুলই গোলাপি রঙের হয়)
F₂ জনুর চেকার বোর্ড / পানেট স্কয়ার (Punnett Square):
F₁ জনুর দুটি গোলাপি ফুলের (Rr × Rr) মধ্যে স্ব-সংকরায়ন ঘটালে উৎপন্ন গ্যামেটসমূহ: R এবং r।
|
গ্যামেট (♂ \ ♀)
|
R
|
r
|
|
R
|
RR (লাল)
|
Rr (গোলাপি)
|
|
r
|
Rr (গোলাপি)
|
rr (সাদা)
|
F₂ জনুর ফলাফল: F₂ জনুতে উৎপন্ন অপত্যের হিসাব:
• বিশুদ্ধ লাল (RR) = ১ টি
• সংকর গোলাপি (Rr) = ২ টি
• বিশুদ্ধ সাদা (rr) = ১ টি
• ফিনোটাইপিক অনুপাত = লাল : গোলাপি : সাদা = ১ : ২ : ১
• জিনোটাইপিক অনুপাত = RR : Rr : rr = ১ : ২ : ১
ঘ. ফারহানের গবেষণার ফলাফল মেন্ডেলের কোন সূত্রের ব্যতিক্রম এবং কেন তা বিশ্লেষণ করো
উত্তর: ফারহানের গবেষণার ফলাফলটি গ্রেগর জোহান মেন্ডেলের প্রথম সূত্রের (পৃথকীকরণ সূত্র / Law of Segregation) একটি অন্যতম ব্যতিক্রম।
১. মেন্ডেলের ১ম সূত্র ও স্বাভাবিক অনুপাত: মেন্ডেলের প্রথম সূত্রানুযায়ী, সংকর জীবে বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যের উপাদান (জিনসমূহ) মিশ্রিত বা পরিবর্তিত না হয়ে পাশাপাশি অবস্থান করে এবং গ্যামেট সৃষ্টির সময় এরা একে অপরের থেকে পৃথক হয়ে ভিন্ন ভিন্ন গ্যামেটে গমন করে। একজোড়া বিপরীত বৈশিষ্ট্যের বিশুদ্ধ জীবে সংকরায়ন ঘটালে F₁ জনুতে কেবল প্রকট বৈশিষ্ট্যটি প্রকাশ পায় এবং F₂ জনুতে ফিনোটাইপিক অনুপাত হয় ৩ : ১ (প্রকট : প্রচ্ছন্ন)।
২. ব্যতিক্রম হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ: উদ্দীপকে লাল ফুল (RR) ও সাদা ফুলের (rr) মধ্যে ক্রস করানোর ফলে F₁ জনুতে মেন্ডেলের নিয়ম অনুযায়ী প্রকট বৈশিষ্ট্য হিসেবে 'লাল' রঙ প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লাল রঙের জিন (R) সাদা রঙের জিনের (r) ওপর সম্পূর্ণরূপে প্রকট হতে পারে না। ফলে উভয় বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণে মধ্যবর্তী 'গোলাপি' বর্ণ (Rr) প্রকাশ পেয়েছে, যা অসম্পূর্ণ প্রকটতা (Incomplete Dominance)।
৩. অনুপাতের পরিবর্তন: পরবর্তীতে F₂ জনুতে (গোলাপি × গোলাপি) অপত্যগুলোর মধ্যে:
• ২৫% বিশুদ্ধ লাল (RR)
• ৫০% সংকর গোলাপি (Rr)
• ২৫% বিশুদ্ধ সাদা (rr)
পাওয়া যায়। এর ফলে মেন্ডেলের ১ম সূত্রের স্বাভাবিক ফিনোটাইপিক অনুপাত ৩ : ১ (৩টি লাল : ১টি সাদা) পরিবর্তিত হয়ে ১ : ২ : ১ (১টি লাল : ২টি গোলাপি : ১টি সাদা) অনুপাতে রূপান্তরিত হয়। এখানে দেখা যায় যে ফিনোটাইপিক অনুপাত ও জিনোটাইপিক অনুপাত একই (১ : ২ : ১) হয়ে যায়।
সিদ্ধান্ত: যেহেতু অসম্পূর্ণ প্রকটতার কারণে F₁ জনুতে প্রকট বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় না এবং F₂ জনুতে স্বাভাবিক ফিনোটাইপিক অনুপাত ৩ : ১ এর পরিবর্তে ১ : ২ : ১ পাওয়া যায়, তাই ফারহানের গবেষণার ফলাফলটি মেন্ডেলের প্রথম সূত্রের একটি সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম।