ব্লগ তালিকায় ফিরে যান
শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম

DYNAMIC CAREER IT & EDUCATION CARE

শিক্ষা, পরীক্ষা প্রস্তুতি ও বিষয়ভিত্তিক পাঠের নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম
আবেদন ফর্ম
8পাঠক 19মিনিট Biology 2nd Paper

সর্বশেষ পোস্ট

20টি
বর্তমান

মানবদেহের প্রতিরক্ষা (ইমিউনিটি) | HSC জীববিজ্ঞান লেকচার শিট

HSC 19মিনিট পড়া
মানবদেহের প্রতিরক্ষা (ইমিউনিটি) | HSC জীববিজ্ঞান লেকচার শিট

মানবদেহের প্রতিরক্ষা (ইমিউনিটি) — সম্পূর্ণ লেকচার শিট

এইচএসসি জীববিজ্ঞান ২য় পত্র · অধ্যায় ৯ · বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য · সর্বশেষ আপডেট: ১৬ অক্টোবর ২০২৬

মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (Immunity) কীভাবে রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে, সহজাত ও অর্জিত অনাক্রম্যতার পার্থক্য কী, অ্যান্টিবডির গঠন, B ও T কোষের ভূমিকা, টিকা, অ্যালার্জি, অটোইমিউন রোগ ও এইডস — এই লেকচার শিটে এসব বিষয় ধাপে ধাপে, ছক ও উদাহরণসহ আলোচনা করা হয়েছে। এটি HSC জীববিজ্ঞান ২য় পত্রের পরীক্ষার্থীদের জন্য সৃজনশীল ও MCQ প্রশ্নের অনুশীলনসহ প্রস্তুত করা হয়েছে।

১. মানবদেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ভূমিকা ও মূল পরিভাষা

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হলো রোগজীবাণুর আক্রমণ ও ক্ষতিকর বস্তু থেকে দেহকে রক্ষা করার সামগ্রিক ব্যবস্থা।

অনাক্রম্যতা (Immunity / ইমিউনিটি): রোগজীবাণু বা তাদের নিঃসৃত বিষের (টক্সিন) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দেহের ক্ষমতা। ল্যাটিন immunis শব্দের অর্থ 'মুক্ত'।

ইমিউনোলজি: যে শাখায় দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হয়।

রোগজীবাণু (Pathogen): ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, প্রোটোজোয়া ও পরজীবী কৃমি।

অ্যান্টিজেন (Antigen): যেকোনো বহিরাগত বস্তু (সাধারণত প্রোটিন বা পলিস্যাকারাইড), যা দেহে অনাক্রম্য প্রতিক্রিয়া ঘটায়।

অ্যান্টিবডি (Antibody): অ্যান্টিজেনের প্রতিক্রিয়ায় B লিম্ফোসাইট (প্লাজমা কোষ) থেকে উৎপন্ন বিশেষ গ্লাইকোপ্রোটিন।

অনাক্রম্যতা বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার (পরীক্ষায় আসে)

বিজ্ঞানীসালআবিষ্কার
এডওয়ার্ড জেনার১৭৯৬গুটিবসন্তের (স্মলপক্স) টিকা; 'টিকার জনক'
লুই পাস্তুর—জীবাণুতত্ত্ব; র‍্যাবিস ও অ্যানথ্রাক্সের টিকা
ইলিয়া মেচনিকফ১৮৮৩ফ্যাগোসাইটোসিস ও কোষীয় ইমিউনিটি তত্ত্ব
পল এরলিখ—হিউমোরাল (অ্যান্টিবডিভিত্তিক) ইমিউনিটি তত্ত্ব; মেচনিকফের সাথে ১৯০৮ সালে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার
বেরিং ও কিতাসাতো১৮৯০অ্যান্টিটক্সিন আবিষ্কার
আলেকজান্ডার ফ্লেমিং১৯২১লাইসোজাইম এনজাইম আবিষ্কার

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তিনটি স্তর

স্তরউপাদানধরন
প্রথম প্রতিরক্ষা রেখাত্বক, শ্লেষ্মা, অশ্রু, লালা, HCl, স্বাভাবিক অণুজীবঅনির্দিষ্ট, সহজাত
দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা রেখাফ্যাগোসাইটোসিস, প্রদাহ, জ্বর, ইন্টারফেরন, NK কোষ, কমপ্লিমেন্টঅনির্দিষ্ট, সহজাত
তৃতীয় প্রতিরক্ষা রেখাB ও T লিম্ফোসাইট, অ্যান্টিবডি, মেমরি কোষনির্দিষ্ট, অর্জিত

২. অনাক্রম্যতার প্রকারভেদ: সহজাত ও অর্জিত

অনাক্রম্যতা প্রধানত দুই প্রকার: সহজাত ও অর্জিত।

ক. সহজাত অনাক্রম্যতা (Innate / Natural Immunity)

জন্মগতভাবে পাওয়া যায়, পূর্ব সংস্পর্শের ওপর নির্ভর করে না, সব ধরনের জীবাণুর বিরুদ্ধে একইভাবে কাজ করে (অনির্দিষ্ট) এবং কোনো স্মৃতি তৈরি করে না। এর তিনটি ধরন:

  • প্রজাতিগত: কোনো প্রজাতি অন্য প্রজাতির রোগে আক্রান্ত হয় না। যেমন মানুষ গবাদিপশুর রিন্ডারপেস্ট রোগে আক্রান্ত হয় না, আবার কুকুরের ডিস্টেম্পারও মানুষের হয় না।
  • জাতিগত (গোষ্ঠীগত): একই প্রজাতির বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে রোগ-সংবেদনশীলতার পার্থক্য। যেমন আফ্রিকার কিছু জনগোষ্ঠীতে সিকল সেল বৈশিষ্ট্য ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে আংশিক সুরক্ষা দেয়।
  • ব্যক্তিগত: বয়স, পুষ্টি, জিনগত গঠন, হরমোন ও স্বাস্থ্যের কারণে ব্যক্তিভেদে পার্থক্য। যেমন শিশু ও বৃদ্ধের প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম।

খ. অর্জিত অনাক্রম্যতা (Acquired / Adaptive Immunity)

জন্মের পর জীবাণু বা অ্যান্টিজেনের সংস্পর্শে এসে অর্জিত হয়। এটি নির্দিষ্ট (specific), স্মৃতিসম্পন্ন (memory) এবং স্বীয়-অস্বীয় পার্থক্য করতে সক্ষম। এটি দুই প্রকার:

  • সক্রিয় অনাক্রম্যতা: দেহ নিজে অ্যান্টিবডি তৈরি করে; ধীরে গড়ে ওঠে, দীর্ঘস্থায়ী, মেমরি কোষ তৈরি হয়।
    • প্রাকৃতিক সক্রিয়: রোগে আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠার পর। যেমন চিকেন পক্স বা হামের পর।
    • কৃত্রিম সক্রিয়: টিকা (ভ্যাকসিন) গ্রহণের মাধ্যমে। যেমন BCG, পোলিও, MR টিকা।
  • নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা: তৈরি অ্যান্টিবডি বাইরে থেকে দেহে আসে; দ্রুত কাজ করে, স্বল্পস্থায়ী, মেমরি কোষ তৈরি হয় না।
    • প্রাকৃতিক নিষ্ক্রিয়: গর্ভাবস্থায় প্ল্যাসেন্টা দিয়ে মায়ের IgG ভ্রূণে যায় এবং শালদুধ (colostrum) ও বুকের দুধের মাধ্যমে IgA শিশু পায়।
    • কৃত্রিম নিষ্ক্রিয়: তৈরি অ্যান্টিসিরাম ইনজেকশন। যেমন টিটেনাস অ্যান্টিটক্সিন, সাপের কামড়ে অ্যান্টিভেনম, র‍্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন।

সক্রিয় বনাম নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা: তুলনা

বিষয়সক্রিয়নিষ্ক্রিয়
অ্যান্টিবডি তৈরি করেদেহ নিজেবাইরে থেকে আসে
কার্যকর হতে সময়বেশি (কয়েক দিন–সপ্তাহ)তাৎক্ষণিক
স্থায়িত্বদীর্ঘস্বল্প
মেমরি কোষতৈরি হয়হয় না
উদাহরণটিকা, রোগ থেকে সেরে ওঠাঅ্যান্টিসিরাম, মায়ের দুধ

৩. সহজাত অনাক্রম্যতার কার্যপ্রণালি

প্রথম প্রতিরক্ষা রেখা (বাহ্যিক প্রতিবন্ধক)

যান্ত্রিক প্রতিবন্ধক

  • ত্বক: বাইরের স্তরে কেরাটিনযুক্ত মৃত কোষ থাকে, যা জীবাণুর প্রবেশে অভেদ্য বাধা। মৃত কোষ ঝরে পড়ার সাথে জীবাণুও সরে যায়।
  • শ্লেষ্মা ঝিল্লি: শ্বাসনালি, পরিপাকনালি ও মূত্রতন্ত্রে শ্লেষ্মা ধুলো ও জীবাণু আটকে রাখে।
  • সিলিয়া: শ্বাসনালির সিলিয়া শ্লেষ্মাসহ জীবাণুকে গলার দিকে ঠেলে দেয়, এরপর কাশি বা গিলে ফেলার মাধ্যমে বের হয়।
  • প্রতিবর্ত ক্রিয়া: হাঁচি, কাশি, বমি ও ডায়রিয়া জীবাণু বের করে দেয়। মূত্রপ্রবাহ মূত্রনালি পরিষ্কার রাখে।

রাসায়নিক প্রতিবন্ধক

  • ঘাম ও সিবাম: ত্বকের অম্লীয় পরিবেশ (pH প্রায় ৩–৫) ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি আটকায়।
  • লাইসোজাইম: অশ্রু, লালা ও নাকের শ্লেষ্মায় থাকা এনজাইম; ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর ভেঙে ফেলে।
  • পাকস্থলীর HCl: অত্যন্ত অম্লীয় (pH প্রায় ১.৫–২) পরিবেশে খাবারের সাথে আসা বেশিরভাগ জীবাণু মরে যায়।
  • যোনির অম্লীয় পরিবেশ ও পুরুষের বীর্যের জিংক-যুক্ত পদার্থও জীবাণু প্রতিরোধে সহায়ক।

জৈবিক প্রতিবন্ধক: ত্বক ও অন্ত্রের স্বাভাবিক অণুজীবকূল (যেমন E. coli, Lactobacillus) খাদ্য ও স্থানের জন্য ক্ষতিকর জীবাণুর সাথে প্রতিযোগিতা করে এবং তাদের বাড়তে দেয় না।

দ্বিতীয় প্রতিরক্ষা রেখা (অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা)

জীবাণু প্রথম বাধা পেরিয়ে ঢুকে পড়লে এই স্তর কাজ করে।

১. ফ্যাগোসাইটোসিস (Phagocytosis)

শ্বেত রক্তকণিকার মাধ্যমে জীবাণু গ্রাস করে হজম করার প্রক্রিয়া।

ফ্যাগোসাইট কোষবৈশিষ্ট্য
নিউট্রোফিলসংখ্যায় সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৫০–৭০% শ্বেতকণিকা); সংক্রমণস্থলে প্রথম পৌঁছায়
মনোসাইটরক্ত থেকে টিস্যুতে গিয়ে ম্যাক্রোফেজে রূপান্তরিত হয় — সবচেয়ে কার্যকর ফ্যাগোসাইট
ইওসিনোফিলপরজীবী কৃমি ও অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে
ডেনড্রিটিক কোষজীবাণু গ্রাস করে T কোষকে অ্যান্টিজেন উপস্থাপন করে

ধাপসমূহ:

  1. কেমোট্যাক্সিস: জীবাণু বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষের নিঃসৃত রাসায়নিকের টানে ফ্যাগোসাইট সংক্রমণস্থলে আসে।
  2. সংযুক্তি (Attachment): ফ্যাগোসাইট জীবাণুর গায়ে আটকে যায় (অপসোনিন অ্যান্টিবডি থাকলে সহজ হয়)।
  3. গ্রাসকরণ (Ingestion): সিউডোপোডিয়া জীবাণুকে ঘিরে ফেলে এবং ফ্যাগোজোম নামক ভেসিকল তৈরি হয়।
  4. পরিপাক: ফ্যাগোজোম লাইসোজোমের সাথে মিলে ফ্যাগোলাইসোজোম গঠন করে; হাইড্রোলাইটিক এনজাইম ও বিষাক্ত অক্সিজেন যৌগ জীবাণু ধ্বংস করে।
  5. নিষ্কাশন: অপাচ্য অংশ এক্সোসাইটোসিসের মাধ্যমে বের হয়ে যায়।
মনে রাখুন: পুঁজ = মৃত নিউট্রোফিল + মৃত জীবাণু + টিস্যু তরল।

২. প্রদাহ (Inflammation)

আঘাত বা সংক্রমণের স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত কোষ ও মাস্ট কোষ থেকে হিস্টামিন, ব্র্যাডিকাইনিন ও প্রোস্টাগ্ল্যান্ডিন নিঃসৃত হয়। ফলে রক্তনালি প্রসারিত ও ভেদ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং ফ্যাগোসাইট দলে দলে আসে।

প্রদাহের পাঁচ লক্ষণ: লালচে ভাব (Rubor), তাপ (Calor), ফোলা (Tumor), ব্যথা (Dolor) এবং কার্যক্ষমতা হ্রাস (Functio laesa)।

৩. জ্বর (Fever)

জীবাণু ও ম্যাক্রোফেজ থেকে নিঃসৃত পাইরোজেন (যেমন ইন্টারলিউকিন-১) হাইপোথ্যালামাসের তাপমাত্রা-সেট পয়েন্ট বাড়িয়ে দেয়। দেহের উচ্চ তাপমাত্রা জীবাণুর বৃদ্ধি কমায় এবং ফ্যাগোসাইটোসিস ও অ্যান্টিবডি উৎপাদন বাড়ায়। তাই মাঝারি জ্বর প্রতিরক্ষারই অংশ।

৪. ইন্টারফেরন (Interferon)

ভাইরাস-আক্রান্ত কোষ থেকে নিঃসৃত গ্লাইকোপ্রোটিন (সাইটোকাইন)। এটি পার্শ্ববর্তী সুস্থ কোষে ভাইরাস-বিরোধী প্রোটিন তৈরিতে সাহায্য করে, ফলে ভাইরাসের প্রতিলিপি বন্ধ হয়। ১৯৫৭ সালে আইজাকস ও লিন্ডেনম্যান এটি আবিষ্কার করেন। ইন্টারফেরন প্রজাতি-নির্দিষ্ট কিন্তু ভাইরাস-নির্দিষ্ট নয় — অর্থাৎ মানবদেহের ইন্টারফেরন সব ভাইরাসের বিরুদ্ধেই কাজ করে, তবে অন্য প্রজাতিতে নয়। ক্যান্সার ও হেপাটাইটিস চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয়।

৫. ন্যাচারাল কিলার (NK) কোষ

এক ধরনের লিম্ফোসাইট যা পূর্ব অ্যান্টিজেন-সংস্পর্শ ছাড়াই কাজ করে। ভাইরাস-আক্রান্ত ও ক্যান্সার কোষে পারফোরিন দিয়ে ছিদ্র করে এবং গ্র্যানজাইম দিয়ে কোষমৃত্যু ঘটায়।

৬. কমপ্লিমেন্ট সিস্টেম

রক্তরসে থাকা প্রায় ৩০টি নিষ্ক্রিয় প্রোটিনের (যকৃতে তৈরি) সমষ্টি। সংক্রমণে ক্রমান্বয়ে সক্রিয় হয়ে (cascade) তিনটি কাজ করে: জীবাণুর গায়ে ছিদ্র করে ধ্বংস (MAC — মেমব্রেন অ্যাটাক কমপ্লেক্স), ফ্যাগোসাইটকে আকর্ষণ এবং জীবাণুকে ফ্যাগোসাইটোসিসের জন্য চিহ্নিত করা (অপসোনাইজেশন)।

৪. অর্জিত অনাক্রম্যতার কার্যপ্রণালি: B ও T লিম্ফোসাইট

লিম্ফোসাইট: প্রধান কারিগর

সব লিম্ফোসাইটের উৎস অস্থিমজ্জার স্টেম কোষ। পরিণত হওয়ার স্থান অনুযায়ী দুই ধরন:

  • B কোষ: অস্থিমজ্জায় (Bone marrow) পরিণত হয়; পাখিতে Bursa of Fabricius থেকে নাম 'B'। এরা হিউমোরাল ইমিউনিটি নিয়ন্ত্রণ করে।
  • T কোষ: অস্থিমজ্জায় তৈরি হয়ে থাইমাস গ্রন্থিতে পরিণত হয়। এরা কোষীয় ইমিউনিটি নিয়ন্ত্রণ করে।

T কোষের প্রকারভেদ

T কোষের ধরনকাজ
সহায়ক T কোষ (Helper T, CD4⁺)সমগ্র ইমিউন প্রতিক্রিয়ার সমন্বয়কারী; B কোষ ও Tc কোষকে সক্রিয় করে। HIV এদেরই আক্রমণ করে
সাইটোটক্সিক T কোষ (Killer T, CD8⁺)আক্রান্ত কোষ সরাসরি ধ্বংস করে
নিয়ন্ত্রক T কোষ (Regulatory T)ইমিউন প্রতিক্রিয়া থামায় ও অটোইমিউনিটি ঠেকায়
মেমরি T কোষপরবর্তী আক্রমণে দ্রুত সাড়া দেয়

MHC অণু (গুরুত্বপূর্ণ ধারণা)

Major Histocompatibility Complex; মানুষে একে HLA বলা হয়। এটি কোষের 'পরিচয়পত্র'।

  • MHC-I: দেহের সব নিউক্লিয়াসযুক্ত কোষে থাকে; Tc কোষের কাছে অ্যান্টিজেন প্রদর্শন করে।
  • MHC-II: শুধু অ্যান্টিজেন-প্রদর্শনকারী কোষে (APC: ম্যাক্রোফেজ, ডেনড্রিটিক কোষ, B কোষ) থাকে; Helper T কোষের কাছে অ্যান্টিজেন প্রদর্শন করে।

হিউমোরাল ইমিউনিটি (অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক)

  1. অ্যান্টিজেন দেহে ঢুকলে ম্যাক্রোফেজ/APC তা গ্রাস করে ও অংশবিশেষ MHC-II-সহ কোষপৃষ্ঠে প্রদর্শন করে।
  2. Helper T কোষ তা শনাক্ত করে সক্রিয় হয় এবং ইন্টারলিউকিন-২ সহ সাইটোকাইন নিঃসরণ করে।
  3. সংশ্লিষ্ট B কোষ অ্যান্টিজেন চিনে সক্রিয় হয় ও বারবার বিভাজিত হয়ে ক্লোন গঠন করে।
  4. ক্লোন থেকে তৈরি হয় প্লাজমা কোষ (অ্যান্টিবডি উৎপাদন কারখানা) এবং মেমরি B কোষ।
  5. অ্যান্টিবডি অ্যান্টিজেনের সাথে যুক্ত হয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় ও ধ্বংসের উপযোগী করে।

এই ব্যবস্থা মূলত রক্তরস ও লসিকায় থাকা জীবাণু, টক্সিন ও কোষের বাইরের জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর।

কোষীয় ইমিউনিটি (T কোষ-ভিত্তিক)

লক্ষ্য: ভাইরাস-আক্রান্ত কোষ, ক্যান্সার কোষ, প্রতিস্থাপিত অঙ্গের কোষ।

  1. আক্রান্ত কোষ MHC-I-সহ অ্যান্টিজেন প্রদর্শন করে।
  2. সাইটোটক্সিক T কোষ তা চিনে সক্রিয় হয় (Helper T কোষের সংকেতে)।
  3. পারফোরিন দিয়ে ছিদ্র করে ও গ্র্যানজাইম দিয়ে কোষকে অ্যাপোপটোসিসে পাঠিয়ে ধ্বংস করে।
  4. কিছু কোষ মেমরি T কোষে পরিণত হয়ে থেকে যায়।

হিউমোরাল বনাম কোষীয় ইমিউনিটি

বিষয়হিউমোরালকোষীয়
প্রধান কোষB কোষ, প্লাজমা কোষT কোষ (Tc, Th)
পরিণতির স্থানঅস্থিমজ্জাথাইমাস
কার্যকারী উপাদানঅ্যান্টিবডিসাইটোটক্সিক T কোষ, সাইটোকাইন
লক্ষ্যকোষের বাইরের জীবাণু ও টক্সিনআক্রান্ত কোষ, ক্যান্সার, প্রতিস্থাপিত অঙ্গ
কার্যক্ষেত্ররক্তরসে কাজ করেসরাসরি কোষ-কোষ সংস্পর্শে

স্মৃতি: প্রাথমিক ও গৌণ সাড়া

প্রথমবার অ্যান্টিজেনের মুখোমুখি হলে প্রাথমিক সাড়া হয়। পরে একই অ্যান্টিজেনের দ্বিতীয় আক্রমণে মেমরি কোষের কারণে গৌণ সাড়া অনেক দ্রুত ও শক্তিশালী হয়। বুস্টার ডোজের যুক্তি এখানেই।

বিষয়প্রাথমিক সাড়াগৌণ সাড়া
সুপ্তকাল (lag)দীর্ঘ (কয়েক দিন)খুব ছোট (১–৩ দিন)
অ্যান্টিবডির পরিমাণকমঅনেক বেশি
প্রধান অ্যান্টিবডিIgMIgG
স্থায়িত্বস্বল্পদীর্ঘ
মেমরি কোষতৈরি হয়আরও বৃদ্ধি পায়

৫. অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি

অ্যান্টিজেন

বৈশিষ্ট্য: বহিরাগত বা 'নন-সেলফ' হওয়া, বড় আণবিক ওজন ও জটিল গঠন (সাধারণত প্রোটিন বা পলিস্যাকারাইড) এবং অ্যান্টিবডির সাথে নির্দিষ্টভাবে যুক্ত হওয়ার ক্ষমতা।

  • এপিটোপ (Epitope / Antigenic determinant): অ্যান্টিজেনের যে ক্ষুদ্র অংশে অ্যান্টিবডি যুক্ত হয়।
  • হ্যাপটেন: ছোট অণু, যা একা ইমিউন সাড়া জাগাতে পারে না, কিন্তু বাহক প্রোটিনের সাথে যুক্ত হলে পারে (যেমন পেনিসিলিন)।
  • উদাহরণ: জীবাণুর পৃষ্ঠের প্রোটিন, টক্সিন, পরাগরেণু, ABO রক্তগ্রুপ অ্যান্টিজেন, Rh ফ্যাক্টর।

অ্যান্টিবডি (ইমিউনোগ্লোবিউলিন, Ig)

অ্যান্টিবডি হলো রক্তরসের গামা-গ্লোবিউলিন শ্রেণির গ্লাইকোপ্রোটিন, যা প্লাজমা কোষ তৈরি করে।

অ্যান্টিবডির গঠন

  • অ্যান্টিবডি একটি Y-আকৃতির অণু, যা ৪টি পলিপেপটাইড শৃঙ্খল দিয়ে গঠিত: ২টি ভারী শৃঙ্খল (H) ও ২টি হালকা শৃঙ্খল (L)।
  • শৃঙ্খলগুলো ডাইসালফাইড (–S–S–) বন্ধন দিয়ে যুক্ত।
  • প্রতিটি শৃঙ্খলের একটি অংশ পরিবর্তনশীল অঞ্চল (V region) — এটি অ্যান্টিজেন-বন্ধনকারী স্থান। অন্য অংশ স্থির অঞ্চল (C region)।
  • Fab অংশ (Fragment antigen binding): Y-এর দুই বাহু; অ্যান্টিজেনের সাথে যুক্ত হয়। একটি অ্যান্টিবডিতে ২টি বন্ধন-স্থান থাকে।
  • Fc অংশ (Fragment crystallizable): Y-এর কাণ্ড; অ্যান্টিবডির শ্রেণি নির্ধারণ করে, ফ্যাগোসাইটের সাথে যুক্ত হয় ও কমপ্লিমেন্ট সক্রিয় করে।
  • কব্জা অঞ্চল (Hinge): বাহু দুটির নমনীয়তা দেয়।
  • V অঞ্চলের অসংখ্য বৈচিত্র্যের কারণে দেহ লক্ষ লক্ষ ধরনের অ্যান্টিজেন মোকাবিলা করতে পারে।

অ্যান্টিবডির পাঁচ শ্রেণি

শ্রেণিবৈশিষ্ট্য ও কাজ
IgGরক্তের অ্যান্টিবডির সিংহভাগ (প্রায় ৭৫–৮০%); একমাত্র যা প্লাসেন্টা পার হতে পারে; গৌণ সাড়ায় প্রধান; অপসোনাইজেশন ও টক্সিন নিষ্ক্রিয়করণ
IgAলালা, অশ্রু, শ্লেষ্মা, শালদুধ ও বুকের দুধে থাকে (ডাইমার আকারে); শ্লেষ্মা ঝিল্লি রক্ষা করে ও শিশুকে নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা দেয়
IgMসবচেয়ে বড় (পেন্টামার, ১০টি বন্ধন-স্থান); প্রাথমিক সাড়ায় প্রথম তৈরি হয়; অ্যাগ্লুটিনেশনে দক্ষ; ABO অ্যান্টিবডি এই শ্রেণির
IgDB কোষের পৃষ্ঠে রিসেপ্টর হিসেবে থাকে; B কোষ সক্রিয়করণে ভূমিকা রাখে
IgEরক্তে সবচেয়ে কম; অ্যালার্জি ও পরজীবী কৃমির বিরুদ্ধে; মাস্ট কোষ থেকে হিস্টামিন নিঃসরণ ঘটায়
মনে রাখার কৌশল: পাঁচ শ্রেণির নাম মনে রাখুন GAMDE (IgG, IgA, IgM, IgD, IgE)।

অ্যান্টিজেন-অ্যান্টিবডি বিক্রিয়া

এটি তালা-চাবির মতো নির্দিষ্ট (specific) বিক্রিয়া। ফলাফলে ঘটে:

  • অ্যাগ্লুটিনেশন (জমাটবদ্ধতা): কণাযুক্ত অ্যান্টিজেন (যেমন RBC, ব্যাকটেরিয়া) জমাট বাঁধে। রক্তগ্রুপ নির্ণয়ে ব্যবহৃত।
  • প্রেসিপিটেশন (অধঃক্ষেপণ): দ্রবণীয় অ্যান্টিজেন অধঃক্ষিপ্ত হয়।
  • নিউট্রালাইজেশন: অ্যান্টিবডি টক্সিন বা ভাইরাসের সাথে যুক্ত হয়ে তাদের ক্ষতিকর ক্ষমতা নষ্ট করে।
  • অপসোনাইজেশন: অ্যান্টিবডি জীবাণুকে মোড়ক দিয়ে ফ্যাগোসাইটের গ্রাসকরণ সহজ করে।
  • কমপ্লিমেন্ট সক্রিয়করণ ও লাইসিস: জীবাণুর কোষ ছিদ্র হয়ে ফেটে যায়।

৬. লিম্ফ্যাটিক (ইমিউন) অঙ্গ

শ্রেণিঅঙ্গকাজ
প্রাইমারি (লিম্ফোসাইট তৈরি ও পরিণত হওয়ার স্থান)অস্থিমজ্জাসব রক্তকোষ তৈরি; B কোষ এখানেই পরিণত হয়
থাইমাস (বুকে, হৃৎপিণ্ডের ওপরে)T কোষ পরিণত হয়; বয়ঃসন্ধির পর ক্রমশ সংকুচিত হয়
সেকেন্ডারি (ইমিউন সাড়া শুরুর স্থান)লসিকাগ্রন্থিলসিকা পরিশোধন; জীবাণু আটকানো (বগল, কুঁচকি, গলায় বেশি)
প্লীহারক্ত ছেঁকে জীবাণু ও পুরোনো RBC ধ্বংস
টনসিল, অ্যাডিনয়েড, পেয়ার্স প্যাচ, অ্যাপেন্ডিক্স (MALT)শ্লেষ্মা ঝিল্লি দিয়ে প্রবেশকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রথম সতর্ক পাহারা

লসিকা (Lymph): রক্তের তরল অংশ কৈশিকনালি থেকে টিস্যুতে চুঁইয়ে এসে লসিকানালির মাধ্যমে ফিরে যায়। এতে RBC থাকে না, কিন্তু লিম্ফোসাইট থাকে। লসিকাগ্রন্থি এই প্রবাহের ফিল্টার।

৭. টিকা ও টিকাদান কর্মসূচি

টিকা (Vaccine): দুর্বল বা মৃত জীবাণু, তার টক্সয়েড বা অ্যান্টিজেনিক অংশ, যা দেহে প্রবেশ করিয়ে রোগ না ঘটিয়ে অ্যান্টিবডি ও মেমরি কোষ তৈরি করা হয়। এটি কৃত্রিম সক্রিয় অনাক্রম্যতা। আর সেরামে তৈরি অ্যান্টিবডি দেওয়া হলে তা কৃত্রিম নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা।

টিকার প্রকারভেদ

প্রকারউদাহরণ
জীবিত দুর্বলকৃত (Live attenuated)BCG, মুখে খাওয়ার পোলিও (OPV), হাম/রুবেলা (MR)
মৃত বা নিষ্ক্রিয় (Inactivated)ইনজেকশন পোলিও (IPV), র‍্যাবিস, হেপাটাইটিস-এ
টক্সয়েড (নিষ্ক্রিয় টক্সিন)ডিপথেরিয়া, টিটেনাস
সাবইউনিট / রিকম্বিন্যান্টহেপাটাইটিস-বি, HPV
কনজুগেটHib, PCV (নিউমোকক্কাল)
mRNAকিছু কোভিড-১৯ টিকা

বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি (EPI)

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (Expanded Programme on Immunization — EPI) বাংলাদেশে ১৯৭৯ সালে শুরু হয়। মূল লক্ষ্য শিশুদের প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষা করা (পাঠ্যবইয়ে ছয় রোগ: যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও, হাম)। নিচে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সূচি দেওয়া হলো।

বয়সটিকা
জন্মের পরBCG (যক্ষ্মা)
৬ সপ্তাহপেন্টাভ্যালেন্ট-১, OPV-১, PCV-১
১০ সপ্তাহপেন্টাভ্যালেন্ট-২, OPV-২, PCV-২
১৪ সপ্তাহপেন্টাভ্যালেন্ট-৩, OPV-৩, PCV-৩, IPV
৯ মাসMR-১ (হাম-রুবেলা)
১৫ মাসMR-২

পেন্টাভ্যালেন্ট = ডিপথেরিয়া + হুপিং কাশি + ধনুষ্টংকার + হেপাটাইটিস-বি + Hib। টিকার সময়সূচি সময়ের সাথে হালনাগাদ হয়, তাই পরীক্ষার জন্য পাঠ্যবইয়ের তালিকা মুখস্থ রাখুন এবং বাস্তব প্রয়োজনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমান সূচি দেখুন।

টিকার সফলতার কারণ

  • ইমিউনোলজিক্যাল মেমরি: মেমরি কোষ দীর্ঘদিন থেকে যায়।
  • হার্ড ইমিউনিটি (Herd immunity): সমাজের যথেষ্ট সংখ্যক মানুষ টিকা নিলে যারা টিকা নিতে পারেননি তারাও পরোক্ষভাবে সুরক্ষিত হন।

৮. প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিপর্যয়: অ্যালার্জি, অটোইমিউন রোগ ও এইডস

ক. অ্যালার্জি (অতি সংবেদনশীলতা)

সংজ্ঞা: নিরীহ কোনো পদার্থের (অ্যালার্জেন) বিরুদ্ধে ইমিউন ব্যবস্থার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া।

অ্যালার্জেনের উদাহরণ: পরাগরেণু, ধুলোর মাইট, চিংড়ি, ডিম, বাদাম, পেনিসিলিন, পোষা প্রাণীর লোম।

  1. প্রথম সংস্পর্শ (সংবেদনশীলকরণ): B কোষ IgE তৈরি করে, যা মাস্ট কোষ ও বেসোফিলের পৃষ্ঠে বসে থাকে।
  2. দ্বিতীয় সংস্পর্শ: অ্যালার্জেন IgE-র সাথে যুক্ত হয়, মাস্ট কোষ ভেঙে হিস্টামিন নিঃসরণ করে।
  3. ফল: হিস্টামিনের ফলে রক্তনালি প্রসারণ ও ভেদ্যতা বৃদ্ধি — হাঁচি, চুলকানি, ফোলা, ফুসকুড়ি, শ্বাসনালির সংকোচন।

রোগ: হে ফিভার, অ্যাজমা, একজিমা, আর্টিকেরিয়া (চর্মরোগ)। সবচেয়ে মারাত্মক রূপ অ্যানাফাইল্যাক্সিস — হঠাৎ রক্তচাপ পড়ে যায় ও শ্বাসকষ্ট হয়, তাৎক্ষণিক চিকিৎসা (এপিনেফ্রিন) প্রয়োজন।

প্রতিকার: অ্যালার্জেন এড়ানো, অ্যান্টিহিস্টামিন, কর্টিকোস্টেরয়েড, ডিসেনসিটাইজেশন (ক্রমে সামান্য মাত্রায় অ্যালার্জেন দিয়ে সহনশীলতা তৈরি)।

খ. অটোইমিউন রোগ

দেহের ইমিউন ব্যবস্থা নিজের কোষকে 'বহিরাগত' ভেবে আক্রমণ করলে অটোইমিউন রোগ হয়। উদাহরণ: টাইপ-১ ডায়াবেটিস (অগ্ন্যাশয়ের β কোষ ধ্বংস), রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস, SLE (লুপাস), গ্রেভস রোগ।

গ. অঙ্গ প্রতিস্থাপন ও প্রত্যাখ্যান

দাতার কোষের MHC (HLA) গ্রহীতার সাথে না মিললে T কোষ প্রতিস্থাপিত অঙ্গকে আক্রমণ করে। তাই টিস্যু টাইপিং (HLA ম্যাচিং) ও ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট (যেমন সাইক্লোস্পোরিন) ব্যবহার করা হয়। একই ব্যক্তির টিস্যু (অটোগ্রাফট) বা জমজের টিস্যু সাধারণত প্রত্যাখ্যাত হয় না।

ঘ. ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ও এইডস (AIDS)

  • AIDS: Acquired Immuno Deficiency Syndrome।
  • HIV: Human Immunodeficiency Virus — একটি রেট্রোভাইরাস। এর জেনেটিক পদার্থ RNA; রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ এনজাইম দিয়ে RNA থেকে DNA তৈরি করে।
  • আবিষ্কার: ১৯৮৩ সালে লুক মন্টেগনিয়ে ও ফ্রাঁসোয়াজ বারে-সিনুসি (পাস্তুর ইনস্টিটিউট)।
  • লক্ষ্য কোষ: সহায়ক T কোষ (CD4⁺)। এই কোষের সংখ্যা কমে গেলে পুরো ইমিউন সমন্বয় ভেঙে পড়ে।
  • সংক্রমণ: অনিরাপদ যৌন মিলন, সংক্রমিত রক্ত বা রক্তজাত পণ্য, ব্যবহৃত সূঁচ-সিরিঞ্জ, সংক্রমিত মা থেকে শিশুতে (গর্ভাবস্থা, প্রসব, বুকের দুধ)।
  • ছড়ায় না: সাধারণ স্পর্শ, কথা বলা, হাঁচি-কাশি, একসাথে খাওয়া, মশা।
  • পর্যায়: তীব্র সংক্রমণ → দীর্ঘ সুপ্তকাল (অনেক বছর) → AIDS (CD4 সংখ্যা খুব কমে যায়; যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, কাপোসি সারকোমার মতো সুযোগসন্ধানী সংক্রমণ দেখা দেয়)।
  • নির্ণয়: প্রাথমিক পরীক্ষা ELISA; নিশ্চিতকরণ ওয়েস্টার্ন ব্লট বা PCR।
  • চিকিৎসা ও প্রতিরোধ: অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (ART) ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখে (সম্পূর্ণ নিরাময় নয়)। প্রতিরোধ: নিরাপদ রক্ত, ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ, নিরাপদ যৌনাচার ও সচেতনতা। বিশ্ব এইডস দিবস ১ ডিসেম্বর।

৯. মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি ও ইমিউনো-রোগনির্ণয়

মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি (mAb): একটিমাত্র B কোষ-ক্লোন থেকে উৎপন্ন, একটি নির্দিষ্ট এপিটোপের বিরুদ্ধে কাজ করে এমন অভিন্ন অ্যান্টিবডি। বিপরীতে পলিক্লোনাল অ্যান্টিবডি বহু B কোষ-ক্লোন থেকে তৈরি এবং বহু এপিটোপ চেনে।

উৎপাদন: হাইব্রিডোমা প্রযুক্তি (কোলার ও মিলস্টাইন, ১৯৭৫)

  1. ইঁদুরকে নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন ইনজেকশন দেওয়া হয়।
  2. ইঁদুরের প্লীহা থেকে অ্যান্টিবডি-উৎপাদনকারী B কোষ সংগ্রহ করা হয়।
  3. B কোষকে অবিরাম বিভাজনক্ষম মায়েলোমা (ক্যান্সার) কোষের সাথে মেলানো হয় (PEG দিয়ে ফিউশন)।
  4. ফলে হাইব্রিডোমা কোষ তৈরি হয়: অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষমতা (B কোষের গুণ) + অনির্দিষ্ট বিভাজন (ক্যান্সার কোষের গুণ)।
  5. বিশেষ মাধ্যমে (HAT) শুধু হাইব্রিডোমা নির্বাচন করা হয় → একক ক্লোন আলাদা করা হয় → বড় আকারে কালচার করে mAb সংগ্রহ করা হয়।

ব্যবহার: গর্ভাবস্থা পরীক্ষা (hCG শনাক্ত), রোগনির্ণয় কিট, ক্যান্সারের লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপনে প্রত্যাখ্যান রোধ, অটোইমিউন রোগের চিকিৎসা, রক্তগ্রুপ ও টিস্যু টাইপিং।

ELISA (Enzyme-Linked Immunosorbent Assay): এনজাইম-যুক্ত অ্যান্টিবডি ব্যবহার করে নমুনায় অ্যান্টিজেন বা অ্যান্টিবডির উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়; সাবস্ট্রেট যোগ করলে রঙ বদলায়। HIV-এর প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ে ব্যবহৃত হয়।

১০. পরীক্ষা প্রস্তুতি

গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সারণি

বিষয়সহজাতঅর্জিত
উৎপত্তিজন্মগতজন্মের পর অর্জিত
নির্দিষ্টতাঅনির্দিষ্ট (সব জীবাণুর বিরুদ্ধে)নির্দিষ্ট (একটি অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে)
স্মৃতিনেইআছে (মেমরি কোষ)
সাড়ার গতিদ্রুত (মিনিট–ঘণ্টা)ধীর (প্রথমবার কয়েক দিন)
প্রধান উপাদানত্বক, ফ্যাগোসাইট, NK কোষ, ইন্টারফেরনB ও T কোষ, অ্যান্টিবডি
বিষয়B কোষT কোষ
পরিণত হওয়ার স্থানঅস্থিমজ্জাথাইমাস
ইমিউনিটির ধরনহিউমোরালকোষীয়
কার্যকর উপাদানপ্লাজমা কোষ ও অ্যান্টিবডিসরাসরি কোষ ধ্বংস বা সংকেত দেয়
অ্যান্টিজেন চেনেকোষের বাইরের অ্যান্টিজেনTh: MHC-II, Tc: MHC-I-এ প্রদর্শিত অ্যান্টিজেন
বিষয়টিকাসেরাম (অ্যান্টিসেরাম)
উপাদানজীবাণু বা তার অংশতৈরি অ্যান্টিবডি
অনাক্রম্যতার ধরনসক্রিয় অনাক্রম্যতানিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা
কার্যকারিতাধীরে কার্যকর, দীর্ঘস্থায়ীতাৎক্ষণিক কার্যকর, স্বল্পস্থায়ী
ব্যবহারপ্রতিরোধমূলকজরুরি চিকিৎসা (যেমন সাপের কামড়, ধনুষ্টংকার)

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর

ইন্টারফেরন প্রজাতি-নির্দিষ্ট কেন?

প্রতিটি প্রজাতির ইন্টারফেরন তার নিজস্ব কোষের রিসেপ্টরের সাথে খাপ খায়, তাই এক প্রজাতির ইন্টারফেরন অন্য প্রজাতিতে একই কার্যকারিতা দেখায় না।

জ্বর কীভাবে প্রতিরক্ষায় সাহায্য করে?

উচ্চ তাপমাত্রায় জীবাণুর বৃদ্ধি কমে এবং ফ্যাগোসাইটোসিস ও অ্যান্টিবডি উৎপাদন বাড়ে।

পুঁজ কী?

মৃত নিউট্রোফিল, মৃত জীবাণু ও টিস্যু তরলের মিশ্রণ।

শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো উচিত কেন?

শালদুধ ও দুধে IgA থাকে, যা শিশুকে প্রাকৃতিক নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা দেয়।

IgG-কে 'প্লাসেন্টাল অ্যান্টিবডি' বলা হয় কেন?

এটিই একমাত্র শ্রেণি যা প্লাসেন্টা পেরিয়ে ভ্রূণে যায়।

বুস্টার ডোজ কেন দেওয়া হয়?

গৌণ সাড়া বাড়িয়ে মেমরি কোষ আরও শক্তিশালী করার জন্য।

অ্যানাফাইল্যাক্সিস কী?

অ্যালার্জেনের বিরুদ্ধে হঠাৎ তীব্র, সারাদেহব্যাপী ও প্রাণঘাতী প্রতিক্রিয়া।

AIDS রোগীর সাধারণ সংক্রমণ মারাত্মক হয় কেন?

সহায়ক T কোষ ধ্বংস হওয়ায় B ও Tc কোষের সক্রিয়করণ ব্যাহত হয়।

সৃজনশীল প্রশ্নের নমুনা

উদ্দীপক: আট বছরের রাতুলের পায়ে মরচে ধরা পেরেক ফুটে যায়। সে আগে ধনুষ্টংকারের টিকা নেয়নি। ডাক্তার তাকে তৈরি অ্যান্টিবডিযুক্ত একটি ইনজেকশন দেন এবং কিছুদিন পর টিকাও দেন।

  • ক. অনাক্রম্যতা কী? (১ নম্বর) → জীবাণু বা তার বিষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার দেহের ক্ষমতা।
  • খ. ফ্যাগোসাইটোসিস বলতে কী বোঝ? (২ নম্বর) → শ্বেত রক্তকণিকা কর্তৃক জীবাণু গ্রাস ও পরিপাক; কেমোট্যাক্সিস → সংযুক্তি → গ্রাসকরণ → পরিপাক → নিষ্কাশন ধাপ বর্ণনা করুন।
  • গ. ডাক্তারের প্রথম ইনজেকশন কোন ধরনের অনাক্রম্যতা দেয়? ব্যাখ্যা করুন। (৩ নম্বর) → কৃত্রিম নিষ্ক্রিয়; কারণ তৈরি অ্যান্টিবডি বাইরে থেকে দেওয়া হয়েছে, দেহ নিজে অ্যান্টিবডি তৈরি করেনি। ফল তাৎক্ষণিক কিন্তু স্বল্পস্থায়ী, মেমরি কোষ তৈরি হয় না।
  • ঘ. দুই ধরনের ইনজেকশন দেওয়ার যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করুন। (৪ নম্বর) → প্রথমটি তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দিয়ে টক্সিন নিষ্ক্রিয় করে (জরুরি প্রয়োজন); দ্বিতীয়টি (টক্সয়েড টিকা) দেহে সক্রিয় অনাক্রম্যতা ও মেমরি কোষ তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয়। দুটির সময়গত পার্থক্য ও পরিপূরক ভূমিকা ব্যাখ্যা করে সিদ্ধান্ত লিখুন।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন (MCQ) অনুশীলন

১. কোন অ্যান্টিবডি প্লাসেন্টা অতিক্রম করে? (ক) IgA (খ) IgG (গ) IgM (ঘ) IgE

উত্তর: খ (IgG)

২. HIV কোন কোষকে আক্রমণ করে? (ক) B কোষ (খ) নিউট্রোফিল (গ) সহায়ক T কোষ (ঘ) NK কোষ

উত্তর: গ (সহায়ক T কোষ)

৩. T কোষ কোথায় পরিণত হয়? (ক) অস্থিমজ্জা (খ) থাইমাস (গ) প্লীহা (ঘ) যকৃত

উত্তর: খ (থাইমাস)

৪. হিস্টামিন নিঃসরণ ঘটায় কোন কোষ? (ক) মাস্ট কোষ (খ) প্লাজমা কোষ (গ) NK কোষ (ঘ) মনোসাইট

উত্তর: ক (মাস্ট কোষ)

৫. প্রাথমিক সাড়ায় প্রথমে কোন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়? (ক) IgG (খ) IgA (গ) IgM (ঘ) IgD

উত্তর: গ (IgM)

৬. লাইসোজাইম আবিষ্কার করেন— (ক) জেনার (খ) পাস্তুর (গ) ফ্লেমিং (ঘ) মেচনিকফ

উত্তর: গ (ফ্লেমিং)

শেষ মুহূর্তের রিভিশন চেকলিস্ট

  • ☐ তিন প্রতিরক্ষা রেখা ও প্রতিটির উপাদান মনে আছে?
  • ☐ সহজাত ও অর্জিত, সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয়ের উদাহরণসহ পার্থক্য লিখতে পারেন?
  • ☐ ফ্যাগোসাইটোসিসের পাঁচ ধাপ ও প্রদাহের পাঁচ লক্ষণ মুখস্থ?
  • ☐ অ্যান্টিবডির গঠনচিত্র (H ও L শৃঙ্খল, Fab, Fc, V ও C অঞ্চল, ডাইসালফাইড বন্ধন) আঁকতে ও লেবেল করতে পারেন?
  • ☐ GAMDE: পাঁচ ইমিউনোগ্লোবিউলিনের কাজ আলাদা করে বলতে পারেন?
  • ☐ হিউমোরাল বনাম কোষীয় ইমিউনিটির ধাপ এবং B-T কোষের ভূমিকা স্পষ্ট?
  • ☐ HIV-এর সংক্রমণ পথ, লক্ষ্য কোষ ও পরীক্ষা (ELISA) জানা আছে?
  • ☐ হাইব্রিডোমা প্রযুক্তির ধাপ ক্রমানুসারে লিখতে পারেন?
সাধারণ ভুল এড়িয়ে চলুন:
  1. 'ইন্টারফেরন ভাইরাস-নির্দিষ্ট' লিখবেন না — এটি প্রজাতি-নির্দিষ্ট।
  2. টিকা ও সেরামের পার্থক্য গুলিয়ে ফেলবেন না।
  3. প্রদাহের লক্ষণে শুধু চারটি লিখে পঞ্চম (কার্যহানি) বাদ দেবেন না।
  4. চিত্র আঁকলে লেবেল ও শিরোনাম দিন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

অনাক্রম্যতা কী?

রোগজীবাণু বা তাদের নিঃসৃত বিষের (টক্সিন) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দেহের ক্ষমতাকে অনাক্রম্যতা বা ইমিউনিটি বলে।

সহজাত ও অর্জিত অনাক্রম্যতার পার্থক্য কী?

সহজাত অনাক্রম্যতা জন্মগত, অনির্দিষ্ট এবং স্মৃতিহীন। অর্জিত অনাক্রম্যতা জন্মের পর অর্জিত, নির্দিষ্ট এবং মেমরি কোষ তৈরি করে।

IgG কেন প্লাসেন্টাল অ্যান্টিবডি বলা হয়?

IgG একমাত্র অ্যান্টিবডি শ্রেণি যা প্লাসেন্টা পেরিয়ে মায়ের দেহ থেকে ভ্রূণে যায়।

টিকা ও সেরামের পার্থক্য কী?

টিকা দিলে দেহ নিজে অ্যান্টিবডি তৈরি করে (সক্রিয় অনাক্রম্যতা)। সেরামে তৈরি অ্যান্টিবডি বাইরে থেকে দেওয়া হয় (নিষ্ক্রিয় অনাক্রম্যতা)।

HIV কোন কোষকে আক্রমণ করে?

HIV প্রধানত সহায়ক T কোষ (CD4⁺ T cell) আক্রমণ করে, যার ফলে ধীরে ধীরে AIDS দেখা দেয়।