ডাইনামিক ক্যারিয়ার
জীববিজ্ঞান লেকচার শিট
বিষয়: ABO রক্তের গ্রুপ এবং Rh ফ্যাক্টর (ABO Blood Group & Rh Factor)
অধ্যায়: মানব শারীরতত্ত্ব (রক্ত ও সংবহন) | লক্ষ্যবস্তু: HSC ও এডমিশন পরীক্ষার্থী / মেডিকেল শিক্ষার্থী |
১. সূচনা ও রক্তের গ্রুপ নির্ধারণের ইতিহাস
মানবদেহের রক্ত দেখতে একই রকম মনে হলেও প্রতিটি মানুষের লোহিত রক্তকণিকার (RBC) প্লাজমা মেমব্রেনে নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিজেন থাকে। এই অ্যান্টিজেনের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে রক্তকে বিভিন্ন গ্রুপে ভাগ করা হয়।
- আবিষ্কার: ১৯০০ সালে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার (Karl Landsteiner) প্রথম মানব রক্তের ABO গ্রুপ সিস্টেম আবিষ্কার করেন। এই অসামান্য আবিষ্কারের জন্য তাঁকে ১৯৩০ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
- Rh ফ্যাক্টর আবিষ্কার: ১৯৪০ সালে কার্ল ল্যান্ডস্টেইনার এবং অ্যালেক্সান্ডার উইনার (Alexander Wiener) যৌথভাবে 'রেসাস মাংকির' (Rhesus Monkey) রক্ত অনুসন্ধান করে Rh ফ্যাক্টর আবিষ্কার করেন।
২. মৌলিক জীববিজ্ঞান: অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি
রক্তের গ্রুপ বুঝতে হলে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডির মিথস্ক্রিয়া বোঝা অত্যন্ত জরুরি:
- অ্যান্টিজেন (Ag / Agglutinogen): লোহিত রক্তকণিকার (RBC) কোষঝিল্লিতে অবস্থিত এক ধরণের প্রোটিন বা গ্লাইকোপ্রোটিন, যা দেহে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত হলে ইমিউন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
- অ্যান্টিবডি (Ab / Agglutinin): রক্তের প্লাজমা বা রক্তরসে অবস্থানকারী বিশেষ এক ধরনের গ্লোবিউলিন প্রোটিন (ইমিউনোগ্লোবিউলিন), যা নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে কাজ করে।
- এগ্লুটিনেশন (Agglutination): যখন বিপরীত অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি মুখোমুখি হয়, তখন রক্তকণিকাগুলো একত্রিত হয়ে জমাট বেঁধে যায়। এই প্রক্রিয়াকে এগ্লুটিনেশন বলা হয়।
৩. ABO রক্তের গ্রুপ (ABO Blood Group System)
মানব রক্তের প্লাজমা মেমব্রেনে মূলত দুই ধরনের অ্যান্টিজেন পাওয়া যায়— Antigen A এবং Antigen B। একইভাবে রক্তরসে দুই ধরনের অ্যান্টিবডি থাকে— Anti-A (α) এবং Anti-B (β)।
এই অ্যান্টিজেনের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মানব রক্তকে ৪টি প্রধান গ্রুপে বিভক্ত করা হয়:
- গ্রুপ A (Group A): RBC-এর গায়ে Antigen A থাকে এবং রক্তরসে Anti-B অ্যান্টিবডি থাকে।
- গ্রুপ B (Group B): RBC-এর গায়ে Antigen B থাকে এবং রক্তরসে Anti-A অ্যান্টিবডি থাকে।
- গ্রুপ AB (Group AB): RBC-এর গায়ে Antigen A ও Antigen B উভয়ই থাকে, তবে রক্তরসে কোনো Anti-A বা Anti-B অ্যান্টিবডি থাকে না।
- গ্রুপ O (Group O): RBC-এর গায়ে কোনো A বা B অ্যান্টিজেন থাকে না, তবে রক্তরসে Anti-A ও Anti-B দুটি অ্যান্টিবডিই বিদ্যমান।
ABO রক্তের গ্রুপের সমন্বয় সারণী (Table 1)
রক্তের গ্রুপ | RBC-তে অ্যান্টিজেন | রক্তরসে অ্যান্টিবডি | কাকে রক্ত দিতে পারবে | কার কাছ থেকে রক্ত নিতে পারবে |
A | A | Anti-B (α) | A, AB | A, O |
B | B | Anti-A (β) | B, AB | B, O |
AB | A এবং B উভয়ই | কোনোটিই নেই | শুধুমাত্র AB | A, B, AB, O (সবাই) |
O | কোনোটিই নেই | Anti-A এবং Anti-B উভয়ই | A, B, AB, O (সবাই) | শুধুমাত্র O |
৪. Rh ফ্যাক্টর (Rh Factor System)
Rh ফ্যাক্টর হলো লোহিত রক্তকণিকার ঝিল্লিতে বিদ্যমান অপর একটি বিশেষ গ্লাইকোপ্রোটিন অ্যান্টিজেন। এটি রেসাস বানরের (Rhesus Macaque) রক্তে প্রথম আবিষ্কৃত হয় বলে একে Rh ফ্যাক্টর বলা হয়।
- Rh-পজিটিভ (Rh+): যাদের RBC-তে Rh অ্যান্টিজেন (প্রধানত D-Antigen) বিদ্যমান, তাদের রক্তকে Rh-পজিটিভ (Rh+) বলা হয়। বিশ্বের প্রায় ৮৫% মানুষ Rh-পজিটিভ।
- Rh-নেগেটিভ (Rh-): যাদের RBC-তে Rh অ্যান্টিজেন নেই, তাদের রক্তকে Rh-নেগেটিভ (Rh-) বলা হয়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: Rh-নেগেটিভ ব্যক্তির রক্তরসে স্বাভাবিকভাবে কোনো Rh-অ্যান্টিবডি (Anti-D) থাকে না। কিন্তু Rh-নেগেটিভ ব্যক্তির শরীরে Rh-পজিটিভ রক্ত প্রবেশ করালে ধীরে ধীরে Anti-D অ্যান্টিবডি তৈরি হতে শুরু করে।
৫. সর্বজনীন দাতা ও গ্রহীতা (Universal Donor & Recipient)
- সর্বজনীন গ্রহীতা (Universal Donor): O Negative (O-ve)O-নেগেটিভ (O-ve) রক্তের লোহিত রক্তকণিকায় A, B বা Rh (D) কোনো অ্যান্টিজেনই বিদ্যমান থাকে না। ফলে এই রক্ত যে কারো শরীরে প্রবেশ করালে কোনো ক্ষতিকর এগ্লুটিনেশন প্রতিক্রিয়া ঘটে না। তাই O-ve কে সর্বজনীন দাতা বলা হয়।
- সর্বজনীন গ্রহীতা (Universal Recipient): AB Positive (AB+ve)AB-পজিটিভ (AB+ve) রক্তের রক্তরসে কোনো Anti-A, Anti-B বা Anti-D অ্যান্টিবডি থাকে না। ফলে এরা যেকোনো গ্রুপের রক্ত গ্রহণ করলেও প্লাজমায় কোনো অ্যান্টিবডি বিক্রিয়া ঘটে না। তাই AB+ve কে সর্বজনীন গ্রহীতা বলা হয়।
৬. এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস (Erythroblastosis Fetalis)
এটি Rh ফ্যাক্টরের জটিলতার কারণে সৃষ্ট গর্ভস্থ শিশুর এক অত্যন্ত মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রক্তাল্পতাজনিত রোগ।
রোগ সৃষ্টির শর্ত ও প্রক্রিয়া:
- ১. প্রাথমিক শর্ত: মা যদি Rh-নেগেটিভ (Rh-ve) হন এবং বাবা যদি Rh-পজিটিভ (Rh+ve) হন, তবে তাদের সন্তান Rh-পজিটিভ (Rh+ve) হবে।
- ২. সংবেদনশীলতা (Sensitization): প্রথম গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের Rh+ve রক্ত অমরা/প্লাসেন্টার মাধ্যমে মায়ের রক্তে প্রবেশ করলে মায়ের অনাক্রম্যতন্ত্র প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং ধীরে ধীরে Anti-D অ্যান্টিবডি ও মেমরি কোষ তৈরি করে। প্রথম সন্তান সাধারণত সুস্থ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে।
- ৩. দ্বিতীয় গর্ভাবস্থা ও প্রতিক্রিয়া: দ্বিতীয়বার মা পুনরায় Rh+ve ভ্রূণ ধারণ করলে মায়ের রক্তে আগে থেকেই প্রস্তুত Anti-D অ্যান্টিবডি অমরা অতিক্রম করে ভ্রূণের রক্তে প্রবেশ করে এবং ভ্রূণের RBC ধ্বংস করতে শুরু করে।
- ৪. ফলাফল: এর ফলে গর্ভস্থ শিশু তীব্র রক্তাল্পতা (Anemia), জন্ডিস (Jaundice), মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গর্ভেই মারা যেতে পারে (Stillbirth)। একেই 'এরিথ্রোব্লাস্টোসিস ফিটালিস' বলে।
প্রতিরোধ ও চিকিৎসা:
প্রথম সন্তান প্রসবের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মাকে 'Anti-D Injection' (যেমন: Anti-Rh immunoglobulins / Rhogam) দিতে হয়। এটি মায়ের শরীরে ভ্রূণ থেকে আসা Rh+ve রক্তকণিকাগুলোকে মায়ের অনাক্রম্যতন্ত্র শনাক্ত করার আগেই ধ্বংস করে ফেলে, ফলে মেমরি সেল বা অ্যান্টিবডি তৈরি হতে পারে না।
৭. রক্ত সঞ্চালনের নীতি ও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় (Blood Transfusion Guidelines)
রক্ত সঞ্চালনের সময় অবশ্যই দাতার অ্যান্টিজেন এবং গ্রহীতার অ্যান্টিবডি পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত (Cross-Matching)।
গ্রহীতার রক্ত (Recipient) | যাদের রক্ত গ্রহণ করতে পারবে | যাদের রক্ত গ্রহণ করতে পারবে না |
Rh+ve গ্রহীতা | Rh+ve এবং Rh-ve উভয় রক্তই গ্রহণ করতে পারবে | কোনো বাধ্যবাধকতা নেই |
Rh-ve গ্রহীতা | শুধুমাত্র Rh-ve রক্ত গ্রহণ করতে পারবে | Rh+ve রক্ত (একবার দিলে পরবর্তীতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হবে) |
AB+ve গ্রহীতা | সকল প্রকার গ্রুপ (A+, A-, B+, B-, AB+, AB-, O+, O-) | কেউ নেই (সর্বজনীন গ্রহীতা) |
O-ve গ্রহীতা | শুধুমাত্র O-ve রক্ত | অন্য যেকোনো গ্রুপের রক্ত (A, B, AB, O+) |
৮. ল্যাবরেটরি পরীক্ষা: রক্তের গ্রুপ নির্ণয় (Blood Grouping Test)
পরীক্ষাগারে রক্তে Anti-A, Anti-B এবং Anti-D সেরাম (Monoclonal Antibodies) মিশিয়ে এগ্লুটিনেশন বা জমাট বাঁধা পর্যবেক্ষণ করে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়।
- পদ্ধতি: ক্লাইন্ট স্লাইডে তিন ফোঁটা রক্ত নিয়ে যথাক্রমে Anti-A, Anti-B এবং Anti-D মেশানো হয়।
- ফলাফল: যদি Anti-A ফোঁটায় রক্ত জমাট বাঁধে → রক্তের গ্রুপ A
- ফলাফল: যদি Anti-B ফোঁটায় রক্ত জমাট বাঁধে → রক্তের গ্রুপ B
- ফলাফল: যদি Anti-A ও Anti-B উভয় ফোঁটায় রক্ত জমাট বাঁধে → রক্তের গ্রুপ AB
- ফলাফল: যদি কোনোটিতেই জমাট না বাঁধে → রক্তের গ্রুপ O
- Rh পরীক্ষা: যদি Anti-D ফোঁটায় রক্ত জমাট বাঁধে → রক্ত Rh-পজিটিভ (+ve)
- Rh পরীক্ষা: যদি Anti-D ফোঁটায় রক্ত জমাট না বাঁধে → রক্ত Rh-নেগেটিভ (-ve)
৯. পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলি (Quick Review)
এক নজরে অতি সংক্ষিপ্ত তথ্য:
|