|
বিশেষ লেকচার শিট: হাইড্রা (Hydra) জীববিজ্ঞান ২য় পত্র (প্রাণীবিজ্ঞান) | অধ্যায় ২: প্রাণীর পরিচিতি |
|
📚 বিষয়: প্রাণীবিজ্ঞান (Zoology) |
🎯 লক্ষ্য: HSC ও ভর্তি পরীক্ষা প্রস্তুতি |
⏱️ অধ্যায়: দ্বিমাত্রিক দ্বিস্তরী প্রাণী - হাইড্রা |
১. হাইড্রার পরিচিতি ও শ্রেণিবিন্যাস (Taxonomy & Introduction)
হাইড্রা (Hydra) হলো নিডারিয়া (Cnidaria) পর্বের অন্তর্ভুক্ত অতি ক্ষুদ্র, স্বাদুপানির মুক্তজীবী, দ্বিত্বকীয় বা দ্বিস্তরী (Diploblastic) প্রাণী। এটি সরলতম বহুকোষী প্রাণীদের অন্যতম। ১৭৪৪ সালে বিজ্ঞানী অ্যাব্রাহাম ট্রেম্বলে (Abraham Trembley) প্রথম হাইড্রার পুনরুৎপত্তি ক্ষমতা আবিষ্কার করেন এবং পরবর্তীতে ১৭৫৮ সালে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বিজ্ঞানী ক্যারোলাস লিনিয়াস (Carolus Linnaeus) গ্রীক পৌরাণিক দানব 'Hydra'-এর নামানুসারে এর নামকরণ করেন।
হাইড্রার সিস্টেমেটিক পজিশন / শ্রেণিবিন্যাস:
|
ট্যাক্সন (Taxon) |
নাম (Name) |
প্রধান শনাক্তকারী বৈশিষ্ট্য (Characteristics) |
|
Phylum (পর্ব) |
Cnidaria |
দ্বিস্তরী দেহপ্রাচীর, সিলেন্টেরন ও নিডোসাইট কোষ বিদ্যমান। |
|
Class (শ্রেণি) |
Hydrozoa |
অরীয় প্রতিসাম্য, পলিপ দশা প্রধান, মেসোগ্লিয়া অকোষীয়। |
|
Order (বর্গ) |
Hydroida |
মেডুসা দশা অনুপস্থিত বা হ্রাসপ্রাপ্ত, কেবল পলিপ দশা উপস্থিত। |
|
Family (গোত্র) |
Hydridae |
একাকী (Solitary), সাধু পানিতে বসবাসকারী, পদচাকতিযুক্ত। |
|
Genus (গণ) |
Hydra |
নলাকার দেহ, চোষক পদচাকতি ও ফাঁপা কর্ষিকাযুক্ত। |
|
Species (প্রজাতি) |
Hydra vulgaris |
স্বচ্ছ হলুদাভ-বাদামী বর্ণ, ৬-১০টি কর্ষিকাযুক্ত। |
বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রধান ৩টি প্রজাতি:
· ১. Hydra viridissima (সবুজ হাইড্রা): সিমবায়োটিক বা মিথোজীবী শৈবাল (Zoochlorella)-এর উপস্থিতির কারণে এদের বর্ণ সবুজ হয়।
· ২. Hydra oligactis (বাদামী হাইড্রা): দেহকাণ্ডের চেয়ে কর্ষিকা অনেক লম্বা এবং বর্ণ বাদামী।
· ৩. Hydra vulgaris (হলুদাভ-বাদামী হাইড্রা): বর্ণ স্বচ্ছ বা হালকা হলুদাভ বাদামী। কর্ষিকা ও দেহকাণ্ড প্রায় সমান লম্বা।
|
📌 মেডিকেল ও ভর্তি পরীক্ষা স্পেশাল নোট |
২. বাহ্যিক দৈহিক গঠন (External Morphology)
একটি স্বাভাবিক পূর্ণাঙ্গ হাইড্রা দেখতে নলাকার, সুতার মতো এবং আনুমানিক ১০-৩০ মিমি (১-৩ সেমি) লম্বা ও ১ মিমি চওড়া। হাইড্রার দেহ অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রসারণশীল এবং দেহকে প্রধানত ৩টি অঞ্চলে ভাগ করা যায়:
· ক. হাইপোস্টোম (Hypostome): দেহের মুক্ত বা অগ্রপ্রান্তে অবস্থিত মোচাকৃতির বা শঙ্কু আকৃতির ছোট অঞ্চল। এর চূড়ায় একটি সংকোচন-প্রসারণশীল মুখছিদ্র (Mouth) থাকে। মুখছিদ্রের মাধ্যমে খাদ্য গ্রহণ ও অপাচ্য বর্জ্য নিষ্কাশন উভয় কাজই সম্পাদিত হয়।
· খ. কর্ষিকা (Tentacles): হাইপোস্টোমের গোড়া থেকে ৬ থেকে ১০টি সরু, ফাঁপা ও দীর্ঘ সুতার মতো কর্ষিকা নির্গত হয়। কর্ষিকার বহিঃপ্রাচীরে অসংখ্য ছোট গুটির মতো অংশ থাকে যাদের 'নেমাটোসিস্ট ব্যাটারি' (Nematocyst battery) বলে। কর্ষিকার প্রধান কাজ: খাদ্য গ্রহণ, আত্মরক্ষা এবং চলনে সাহায্য করা।
· গ. দেহকাণ্ড (Trunk): হাইপোস্টোমের নিচ থেকে পদচাকতির উপর পর্যন্ত অংশকে দেহকাণ্ড বলে। এতে নিম্নলিখিত অংশগুলো দেখা যায়:
• মুকুল
(Bud): গ্রীষ্মকালে পর্যাপ্ত খাদ্যের উপস্থিতিতে অযৌন প্রজননের জন্য দেহকাণ্ডে মুকুল সৃষ্টি হয়।
• জননাঙ্গ (Gonads): শরৎ ও শীতকালে অস্থায়ী জননাঙ্গ দেখা যায়। দেহকাণ্ডের উপরের অর্ধাংশে মোচাকৃতির শুক্রাশয়
(Testis) এবং নিচের অর্ধাংশে গোলাকার ডিম্বাশয়
(Ovary) তৈরি হয়।
· ঘ. পদতল বা পদচাকতি (Pedal / Basal Disc): দেহের নিম্নপ্রান্তে অবস্থিত চ্যাপ্টা, আঠালো চাকতির মতো অংশ। এর গ্রন্থিকোষ থেকে আঠালো রস ক্ষরণ করে হাইড্রা যেকোনো বস্তুর সাথে শক্তভাবে আটকে থাকে। এছাড়া এটি পিচ্ছিল রস ক্ষরণ করে গ্লাইডিং চলনে এবং বায়ুর বুদ্বুদ তৈরি করে ভাসতে সাহায্য করে।
৩. দেহপ্রাচীরের অণুবীক্ষণীয় গঠন (Diploblastic Body Wall)
হাইড্রা একটি দ্বিস্তরী বা দ্বিত্বকীয় (Diploblastic) প্রাণী। অর্থাৎ ভ্রূণীয় বিকাশের সময় এদের দেহে কেবল দুটি স্তর গঠিত হয়— বাইরের এপিডার্মিস (Epidermis) এবং ভিতরের গ্যাস্ট্রোডার্মিস (Gastrodermis)। এই দুই স্তরের মাঝে অকোষীয় জেলি-সদৃশ মেসোগ্লিয়া (Mesoglea) অবস্থিত।
১. এপিডার্মিস বা বহিত্বকের কোষসমূহ (৭ প্রকার):
· ১. পেশি-আবরণী কোষ (Musculo-epithelial cells): এপিডার্মিসের প্রধান গঠনকারী কোষ। বাইরের দিকে প্রশস্ত এবং ভিতরের দিকে সরু পেশিপ্রবর্ধক (Myoneme) যুক্ত। কাজ: দেহ প্রাচীর রক্ষা ও সংকোচন-প্রসারণ।
· ২. ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ (Interstitial cells): পেশি-আবরণী কোষের ফাঁকে ফাঁকে গুচ্ছাকারে অবস্থান করে। এগুলো গোল বা ত্রিকোণাকার এবং সুস্পষ্ট নিউক্লিয়াসযুক্ত। এগুলো 'টোটিপোটেন্ট কোষ'— যা অন্য যেকোনো কোষে রূপান্তরিত হতে পারে।
· ৩. সংবেদী কোষ (Sensory cells): সরেজমিনে ছড়ানো সরু ও লম্বাকৃতির কোষ। শীর্ষে সংবেদী রোম থাকে। পরিবেশ থেকে আলো, তাপ ও রাসায়নিক উদ্দীপনা গ্রহণ করে।
· ৪. স্নায়ু কোষ (Nerve cells): মেসোগ্লিয়ার ঘেঁষে অবস্থিত তারা আকৃতির কোষ। এগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে স্নায়ুজালিকা (Nerve net) গঠন করে।
· ৫. গ্রন্থি কোষ (Gland cells): প্রধানত পদচাকতি ও মুখছিদ্রের চারপাশে বেশি থাকে। আঠালো পদার্থ ও মিউকাস ক্ষরণ করে।
· ৬. জনন কোষ (Germ cells): প্রজনন ঋতুতে ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ থেকে রূপান্তরিত হয়ে শুক্রাণু (Sperm) ও ডিম্বাণু (Ovum) তৈরি করে।
· ৭. নিডোসাইট কোষ (Cnidocyte): হাইড্রার এক বিশেষায়িত কোষ। পদচাকতি ছাড়া সর্বত্র (বিশেষ করে কর্ষিকায়) থাকে। এতে নেমাটোসিস্ট থলি থাকে যা আত্মরক্ষা, খাদ্য গ্রহণ ও চলনে ব্যবহৃত হয়।
২. গ্যাস্ট্রোডার্মিস বা অন্তস্ত্বাকের কোষসমূহ (৫ প্রকার):
গ্যাস্ট্রোডার্মিস প্রধানত পরিপাকের সাথে জড়িত। এতে ৫ ধরনের কোষ থাকে: (১) পুষ্টি-পেশি কোষ [ফ্ল্যাজেলীয় ও ক্ষণপদীয়], (২) ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ, (৩) গ্রন্থি কোষ, (৪) সংবেদী কোষ এবং (৫) স্নায়ু কোষ।
*(বিশেষ সতর্কবার্তা: গ্যাস্ট্রোডার্মিসে নিডোসাইট ও জনন কোষ অনুপস্থিত থাকে।)*
৩. মেসোগ্লিয়া (Mesoglea):
এপিডার্মিস ও গ্যাস্ট্রোডার্মিসের মধ্যবর্তী মাত্র ০.১ মাইক্রোমিটার (0.1 µm) পুরু, অকোষীয়, স্বচ্ছ, জেলি-সদৃশ মেসোগ্লিয়া স্তর অবস্থিত। এটি হাইড্রার কঙ্কাল হিসেবে কাজ করে এবং দৈহিক নমনীয়তা প্রদান করে।
এপিডার্মিস ও গ্যাস্ট্রোডার্মিসের তুলনামূলক পার্থক্য:
|
বিষয় / বৈশিষ্ট্য |
এপিডার্মিস (Epidermis) |
গ্যাস্ট্রোডার্মিস (Gastrodermis) |
|
উৎপত্তি (Origin) |
ভ্রূণীয় এক্টোডার্ম (Ectoderm) থেকে |
ভ্রূণীয় এন্ডোডার্ম (Endoderm) থেকে |
|
কোষের সংখ্যা |
৭ প্রকার কোষ উপস্থিত |
৫ প্রকার কোষ উপস্থিত |
|
বিশেষ কোষ |
নিডোসাইট ও জনন কোষ থাকে |
নিডোসাইট ও জনন কোষ থাকে না |
|
প্রধান কাজ |
দেহের আবরণ, আত্মরক্ষা ও জনন |
খাদ্য পরিপাক ও শোষণ |
৪. নিডোসাইট ও নেমাটোসিস্ট (Cnidocyte and Nematocysts)
নিডোসাইট (Cnidocyte) হলো নিডারিয়া পর্বের প্রাণীদের অনন্য বৈশিষ্ট্যসূচক আত্মরক্ষা ও শিকার ধরার বিশেষায়িত কোষ। নিডোসাইট কোষের অভ্যন্তরে প্রোটিন ও ফেনলের মিশ্রণে গঠিত 'হিপনোটক্সিন' (Hypnotoxin) বিষাক্ত তরলপূর্ণ নেমাটোসিস্ট থলি অবস্থান করে।
নিডোসাইটের সূক্ষ্ম গঠন উপাদান:
· • নেমাটোসিস্ট (Nematocyst): কাইটিন নির্মিত বিষাক্ত দ্রবণ পূর্ণ গোলাকার বা ডিম্বাকার থলি।
· • অপারকুলাম (Operculum): নেমাটোসিস্টের মাথার উপরে অবস্থিত ছোট ঢাকনা।
· • নিডোসিল (Cnidocil): কোষের মুক্ত প্রান্তে অবস্থিত শক্ত, স্পর্শকাতর উদ্দীপক রোম বা ট্রিগার (Trigger)। এতে স্পর্শ লাগলেই ঢাকনা খুলে যায়।
· • পেঁচানো সূত্রক ও বাট (Thread & Shaft): নেমাটোসিস্টের ভেতরে গুটানো অবস্থায় থাকা ফাঁপা নল বা সূত্রক। সূত্রকের গোড়ার চওড়া অংশকে বাট বা শ্যাফ্ট বলে। এতে ৩টি বড় কাঁটা (Barb) এবং অসংখ্য ছোট কাঁটা (Barbiule) থাকে।
· • ল্যাসো (Lasso): নেমাটোসিস্ট থলির পেছনের দিকে থাকা সংকোচনশীল সুতা যা কোষ থেকে থলিকে অনাকাঙ্ক্ষিত ছিটকে যাওয়া থেকে ধরে রাখে।
হাইড্রার ৪ প্রকার নেমাটোসিস্টের তুলনা (Werner, 1965):
|
নেমাটোসিস্টের প্রকার |
গঠনগত বৈশিষ্ট্য |
সূত্রকের প্রকৃতি |
প্রধান কাজ |
|
১. স্টেনোটেল / পেনিট্রেন্ট |
আকারে বৃহত্তম। বাট সুগঠিত, ৩টি বড় বার্ব ও ৩ সারি বারবিউলযুক্ত। |
উন্মুক্ত ও কাঁটাযুক্ত ফাঁপা সূত্রক। হিপনোটক্সিন ক্ষরণ করে। |
শিকারের দেহে বিষ ঢেলে শিকারকে অবশ ও বিদ্ধ করা। |
|
২. ভলভেন্ট / ডেসমোনিম |
আকারে ক্ষুদ্রতম। বাট নেই। |
বন্ধ, খাটো, স্থিতিস্থাপক ও পেঁচানো রশির মতো। |
শিকারের উপাঙ্গ বা রোম শক্তভাবে পেঁচিয়ে ধরা। |
|
৩. স্ট্রেপ্টোলিন গ্লুটিন্যান্ট |
বাট সুগঠিত নয়। |
লম্বা, উন্মুক্ত, সর্পিলাকার কাঁটাযুক্ত সূত্রক। |
আঠালো রস ক্ষরণ করে শিকার আটকে রাখা ও চলন। |
|
৪. স্টেরিওলিন গ্লুটিন্যান্ট |
বাট অনুপস্থিত। |
উন্মুক্ত, সোজা ও কাঁতাহীন মসৃণ সূত্রক। |
আঠালো রস ক্ষরণ করে চলনে সাহায্য করা। |
|
📌 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
৫. খাদ্য গ্রহণ ও পরিপাক প্রক্রিয়া (Feeding and Digestion)
হাইড্রা একটি মাংসাশী (Carnivorous) প্রাণী। এদের প্রধান খাদ্য হলো ক্ষুদ্রাকৃতির ক্রাস্টেসিয়ান সন্ধিপদী প্রাণী (যেমন: Daphnia, Cyclops), কীটের লার্ভা, ক্ষুদে কৃমি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র জলজ জীব।
খাদ্য পরিপাক প্রণালী (২টি ধাপে সম্পন্ন হয়):
· ১. বহিঃকোষীয় পরিপাক (Extracellular Digestion): খাদ্য মুখছিদ্র দিয়ে সিলেন্টেরনে (Coelenteron) প্রবেশ করার পর গ্যাস্ট্রোডার্মিসের গ্রন্থিকোষ থেকে এসিড ও এনজাইম নিশ্চিত হয়। এসিডিক পরিবেশে শিকার মারা যায় এবং প্রোটিয়েজ এনজাইমের প্রভাবে প্রোটিন ভেঙে পেপ্টোনে পরিণত হয়। সিলেন্টেরনে আংশিক পরিপাক ঘটে।
· ২. অন্তঃকোষীয় পরিপাক (Intracellular Digestion): সিলেন্টেরনে আংশিক পরিপাককৃত খাদ্যকণাগুলোকে গ্যাস্ট্রোডার্মিসের পুষ্টি কোষের ক্ষণপদ (Pseudopodia) দ্বারা গ্রাস করে খাদ্য গহ্বর (Food vacuole) গঠন করা হয়। কোষের ভেতরে ট্রিপসিন, লাইপেজ ইত্যাদি এনজাইমের প্রভাবে সম্পূর্ণ పరిపాক হয়। সাইটোপ্লাজমে পুষ্টি উপাদান শোষিত হয়।
|
📌 পরীক্ষার অনুধাবনমূলক প্রশ্ন |
৬. হাইড্রার চলন প্রক্রিয়া (Locomotion in Hydra)
হাইড্রা একটি আবদ্ধ বা স্বাধীন মুক্তজীবী প্রাণী হলেও স্থান পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন প্রকার চলন কৌশল ব্যবহার করে। নিচে হাইড্রার প্রধান চলন পদ্ধতিসমূহ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. লুপিং বা হামাগুড়ি (Looping):
এটি ধীরগতির চলন প্রক্রিয়া। সাধারণ দূরত্ব অতিক্রমের জন্য হাইড্রা লুপিং ব্যবহার করে।
পদ্ধতি: হাইড্রা দেহকে প্রসারিত করে বাঁকায় এবং কর্ষিকা দিয়ে ভিত্তিকে স্পর্শ করে। এরপর পদচাকতিকে মুক্ত করে মুখছিদ্রের কাছাকাছি এনে স্থাপন করে। ফলে জোঁকের মতো লুপ (Loop) তৈরি হয়। পরবর্তীতে কর্ষিকা উঠিয়ে সোজা হয়।
২. সমারসল্টিং বা ডারাবাজি (Somersaulting):
এটি হাইড্রার
**প্রধান ও দ্রুততম** চলন প্রক্রিয়া। দূরবর্তী স্থানে দ্রুত যাওয়ার জন্য হাইড্রা সমারসল্টিং সম্পন্ন করে।
পদ্ধতি: হাইড্রা দেহকে বাঁকিয়ে কর্ষিকার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ায় (উল্টো হয়ে দাঁড়ায়)। এরপর পদচাকতিকে অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরিয়ে সামনের দিকে স্থাপন করে। অর্থাৎ এক পদক্ষেপে দুটি লুপ বা ডিগবাজি সম্পন্ন করে।
লুপিং ও সমারসল্টিং এর মূল পার্থক্য:
|
তুলনার বিষয় |
লুপিং (Looping) |
সমারসল্টিing (Somersaulting) |
|
গতি ও প্রকৃতি |
ধীরগতির সাধারণ চলন পদ্ধতি। |
দ্রুতগতির প্রধান চলন পদ্ধতি। |
|
লুপের সংখ্যা |
একবারে একটি লুপ তৈরি হয়। |
একবারে দুটি লুপ বা ডিগবাজি ঘটে। |
|
কর্ষিকার ওপর ভর |
কর্ষিকার ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ায় না। |
কর্ষিকার ওপর ভর দিয়ে সম্পূর্ণ উল্টো হয়ে দাঁড়ায়। |
|
অতিক্রান্ত দূরত্ব |
কম দূরত্ব অতিক্রম করে। |
তুলনামূলক বেশি দূরত্ব অতিক্রম করে। |
অন্যান্য বিশেষ চলন পদ্ধতি:
· ৩. গ্লাইডিং (Gliding): পদচাকতির ক্ষণপদীয় কোষের সাহায্যে সমতল তলে খুব ধীরে স্থান পরিবর্তন করে।
· ৪. সাঁতার (Swimming): কর্ষিকাগুলোকে একত্রিত করে ঢেউয়ের মতো আন্দোলন সৃষ্টি করে পানিতে সাঁতার কাটে।
· ৫. ভাসন (Floating): পদচাকতির গ্রন্থিকোষ থেকে বায়ুর বুদ্বুদ তৈরি করে পানির উপরিভাগে উল্টো হয়ে ভেসে থাকে।
· ৬. আরোহণ ও অবরোহণ (Climbing & Crawling): জলজ উদ্ভিদের শাখা-প্রশাখায় কর্ষিকা আটকে টেনে টেনে উপরে ওঠে বা নিচে নামে।
৭. প্রজনন ও পুনরুৎপত্তি (Reproduction and Regeneration)
হাইড্রা অযৌন ও যৌন উভয় উপায়ে প্রজনন সম্পন্ন করে থাকে।
ক. অযৌন প্রজনন (Asexual Reproduction):
· ১. মুকুলোদ্গম (Budding): গ্রীষ্মকালে পর্যাপ্ত খাদ্যের উপস্থিতিতে হাইড্রার স্বাভাবিক প্রজনন পদ্ধতি। ইন্টারস্টিশিয়াল কোষের দ্রুত বিভাজনের ফলে দেহকাণ্ডে মুকুল (Bud) তৈরি হয়। মুকুলটি ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে শিশু হাইড্রায় পরিণত হয় এবং মাতৃদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন জীবনযাপন শুরু করে।
· ২. দ্বি-বিভাজন (Fission): দুর্ঘটনাজনিত কারণে দেহ দৈর্ঘ্য বা প্রস্থ বরাবর খণ্ডিত হলে প্রতিটি খণ্ড থেকে নতুন হাইড্রা সৃষ্টি হয়।
খ. যৌন প্রজনন (Sexual Reproduction):
অনুকূল পরিবেশের অভাবে (শরৎ ও শীতকালে) হাইড্রায় অস্থায়ী জননাঙ্গ উৎপন্ন হয়। হাইড্রা সাধারণত একলিঙ্গ বা উভলিঙ্গ হতে পারে, তবে স্ব-নিষেক রোধে পরনিষেক ঘটে।
· • শুক্রাশয় (Testis): দেহের ঊর্ধ্বাংশে মোচাকৃতির অঙ্গ। এর ভেতরে শুক্রাণু তৈরি হয়।
· • ডিম্বাশয় (Ovary): দেহের নিম্নাংশে গোলাকার অঙ্গ। এতে ডিম্বাণু উৎপন্ন হয়।
· • পরিস্ফুটন দশা: জাইগোট → ক্লিভেজ → মোরুলা → ব্লাস্টুলা → গ্যাস্ট্রুলা → সিস্টেকৃত দশা → হাইড্রুলা → নতুন হাইড্রা।
গ. পুনরুৎপত্তি ক্ষমতা (Regeneration):
১৭৪৪ সালে বিজ্ঞানী অ্যাব্রাহাম ট্রেম্বলে হাইড্রার পুনরুৎপত্তি ক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করেন। হাইড্রার দেহকে কয়েকটি টুকরো করলে প্রতিটি খণ্ড ইন্টারস্টিশিয়াল কোষের পুনঃরূপান্তরের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ হাইড্রায় পরিণত হতে পারে। ইন্টারস্টিশিয়াল কোষের এই 'টোটিপোটেন্ট' গুণের কারণেই এটি সম্ভব হয়।
ঘ. শ্রমবণ্টন (Division of Labor):
· ১. শারীরবৃত্তীয় শ্রমবণ্টন: দেহের বিভিন্ন কোষ বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজ (যেমন: নিডোসাইট আত্মরক্ষায়, পুষ্টি কোষ পরিপাকে, ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ পুনরুৎপত্তিতে) আলাদাভাবে ভাগ করে সম্পন্ন করে।
· ২. অঙ্গসংস্থানিক শ্রমবণ্টন: হাইড্রার দেহে পলিপ (একাকী নি নিশ্চল দশা) এবং অন্যান্য অঙ্গসংস্থানিক ইউনিটের মধ্যে কাজের পার্থক্য দেখা যায়।
৮. এইচএসসি ও ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ব্যাংক (Practice Q&A)
জ্ঞানমূলক প্রশ্নোত্তর (১ মার্কস):
·
প্রশ্ন ১: হাইড্রার দেহের বিষাক্ত তরলের নাম কি?
উত্তর: হিপনোটক্সিন (প্রোটিন ও ফেনলের মিশ্রণ)।
·
প্রশ্ন ২: হাইড্রার কোন কোষকে টোটিপোটেন্ট কোষ বলা হয়?
উত্তর: ইন্টারস্টিশিয়াল কোষকে (Interstitial cell)।
·
প্রশ্ন ৩: হাইড্রার সবচেয়ে বড় নেমাটোসিস্ট কোনটি?
উত্তর: স্টেনোটেল বা পেনিট্রেন্ট (Stenotele / Penetrant)।
·
প্রশ্ন ৪: হাইড্রার প্রধান ও দ্রুততম চলন পদ্ধতির নাম কি?
উত্তর: সমারসল্টিং বা ডারাবাজি (Somersaulting)।
·
প্রশ্ন ৫: হাইড্রার গ্যাস্ট্রোভাস্কুলার গহ্বরকে কি বলা হয়?
উত্তর: সিলেন্টেরন (Coelenteron)।
অনুধাবনমূলক প্রশ্নোত্তর (২ মার্কস):
·
প্রশ্ন ১: হাইড্রাকে কেন দ্বিস্তরী প্রাণী বলা হয়?
উত্তর: ভ্রূণীয় বিকাশের সময় হাইড্রার দেহ প্রাচীরে কেবল দুটি কোষীয় স্তর (বাইরের এক্টোডার্ম/এপিডার্মিস এবং ভেতরের এন্ডোডার্ম/গ্যাস্ট্রোডার্মিস) গঠিত হয় এবং মাঝে অকোষীয় মেসোগ্লিয়া থাকে। তাই হাইড্রাকে দ্বিস্তরী বা দ্বিত্বকীয় প্রাণী বলা হয়।
·
প্রশ্ন ২: হাইড্রার সিলেন্টেরনকে কেন গ্যাস্ট্রোভাস্কুলার গহ্বর বলা হয়?
উত্তর: সিলেন্টেরন গহ্বরে একাধারে খাদ্য পরিপাক (Gastric function) ঘটে এবং পরিপাককৃত খাদ্যের সারবস্তু ও শসন গ্যাস পরিবাহিত (Vascular function) হয়। এই দ্বিবিধ ভূমিকার কারণে একে গ্যাস্ট্রোভাস্কুলার গহ্বর বলে।
·
প্রশ্ন ৩: হাইড্রাকে কেন 'অমর প্রাণী' বলা হয়?
উত্তর: হাইড্রার দেহে অনবরত ইন্টারস্টিশিয়াল কোষ বিভাজিত হয়ে পুরাতন কোষকে নতুন কোষ দিয়ে প্রতিস্থাপন করে। ফলে স্বাভাবিক বার্ধক্যে এদের মৃত্যু হয় না, এজন্য এদের অমর প্রাণী বলা হয়।
|
📌 ⚡ Quick Revision Flashcards for Admission Tests |